Saturday, September 12, 2020

রক্তাক্ত পঁচাত্তর: ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ!

‘সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। খুব ভোরে আমাদের ঘুমে থেকে ডেকে তুললেন বাবা। তাকে খুব ব্যথিত দেখাচ্ছিলো। কান্নাভেজা গলায় বললেন -ওরা শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে’। মুনতাসীর মামুনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে অনেকটা এরকমই ছিল বেনজীর ভুট্টোর স্মৃতিচারণ।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট দীর্ঘপ্রতিদ্বন্দ্বির মৃত্যুর খবরে মেয়ের চোখে এমন প্রতিক্রিয়াই ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন সাক্ষ্য দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবরটা ভুট্টোর কাছে প্রত্যাশিত ছিল, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছে পৌঁছে যায় তা। নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারকে সবার আগে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। স্বীকৃতির সঙ্গে নজরানাও ছিল। অত্যন্ত খুশীর সংবাদে যেমন দেয় তার মতো সামন্তপ্রভুরা। ৫০ হাজার টন চাল, প্রচুর থানকাপড় এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রী নিয়ে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশে’ এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয় পাকিস্তানি জাহাজ সাফিনা-ই-ইসমাইল।

ভুট্টোর খুশি ডাবল হওয়ার কারণ ছিল। ১৫ অগাস্ট নির্মম সে হত্যাকাণ্ড শেষে বাংলাদেশের সুন্নতে খাতনাটাও সেরে ফেলে খুনির দল। রক্তাক্ত সে ভোরে ইথারে ভেসে আসে:

আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। জননেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র।

ভুট্টোর মনে পড়ে যাওয়ার কথা চার বছর আগের সেই জনসভা। না হয় একটু খুন-জখম হয়েছে। তাই বলে মুসলমান একটা দেশকে আলাদা হয়ে যেতে হবে! তাও জন্মশত্রু ভারতের কোলে চেপে! হিন্দুদের দালাল মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতার বড়ি গেলা স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের উদ্দেশ্যে শুনিয়েছিলেন তার সেই অমর বাণী: শুয়োরকে বাচ্চে, জাহান্নামমে যাও…। সেই ‘শুয়োরের বাচ্চাদের’ এখন বুকে তুলে নিতে বাধা নেই, হাজার হোক ‘মুসলমান’ ‘মুসলমান’ ভাই ভাই।

উপরের কথাগুলো যাদের কাছে শ্লেষাত্মক মনে হচ্ছে, তাদের সবিনয়ে জানাই যে শুধু ভুট্টোই নয়, গোটা পাকিস্তানে মুজিব হত্যার প্রতিক্রিয়া ছিল ঠিক এরকম। ১৫ আগস্ট রাতে পাকিস্তান সরকারের পাঠানো আনুষ্ঠানিক বিবৃতিটি সেদেশের পত্রিকাগুলোয় পৌছে, তাতে শেখ মুজিবের হত্যায় শোকও প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানের বিভক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাতে উল্লিখিত উপহারের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে ভুট্টোর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়:

As a first and spontaneous gesture to the fraternal people of Bangladesh, I have decided to immediately dispatch to Bangladesh as a gift from the people of Pakistan 50,000 tons of rice, 10 million yards of long cloth and five million yards of bleached mull. This is only a modest contribution of our people to our brothers in Bangladesh in their hour of need. We are prepared to make a greater contribution within our greater capacity for the well being of the people of Bangladesh with whom we have shared common nationhood and destiny. Let the world know that we stand together in weal and woe. We respectfully urge the state members of the Islamic conference to accord recognition to the new government of the Islamic Republic of Bangladesh and we appeal to all countries of the third world to do likewise. This appeal stems from our anguished awareness of how our country has dismembered by an international conspiracy culminating in aggression. I grieve that Sheikh Mujibur Rahman and members of his family have met a tragic end.

মাসচারেক আগে পাকিস্তান থেকে আরেকটি শোকবার্তা গিয়েছিল বাংলাদেশে, খোদ বঙ্গবন্ধুর কাছে। শেখ মুজিবের পিতার মৃত্যুতে ভুট্টো সান্তনা জানিয়েছিলেন।

স্বীকৃতির পাশাপাশি খন্দকার মোশতাকের কাছে একটি ব্যক্তিগত বার্তাও পাঠান ভুট্টো। তাতে সামরিক অভ্যুত্থানের নামে সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যদি হুমকির মুখে পড়ে তাহলে সর্বশক্তি দিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। ভুট্টো লেখেন:

Pakistan will resolutely undertake efforts to uphold and defend the political independence, the state sovereignty and territorial integrity of Bangladesh.

এবার দেখা যাক পাকিস্তানের জনগণ কিভাবে নিয়েছিল খবরটা। ২০ অগাস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দুতাবাস থেকে পাঠানো তারবার্তায় লেখা হয় :

News of the murder of Mujib was received with satisfaction by press and many Pakistanis, only a few intellectuals seemed to regret the violent manner in which he was removed, but not the results. Mujib was widely characterized as a traitor to Pakistan and Islam whose establishment of a dictatorship was the immediate cause of his downfall and who had died as a traitor and dictator should.

সেখানে জামাতে ইসলামীর আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা মওদুদীর প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাকে ‘আল্লাহর আশীর্বাদ এবং ইসলামের বিজয়’ বলে উল্লেখ করা হয়। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে পাকিস্তানি জনগণ মনে করে, মুজিব হত্যায় ভুট্টোর হাত আছে এবং ভুট্টোও ঠারেঠোরে তা বুঝিয়ে দেন।

ওই বার্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি ছিল বাংলাদেশের ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিষয়ক সংশয়। ভুট্টো আগ বাড়িয়ে তার বিবৃতিতে বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ বলে উল্লেখ করলেও তার আড়াইদিন পরও বাংলাদেশ সরকার তরফে এমন কোনো ঘোষণা আসেনি। বড় মুখ করে বিভিন্ন ইসলামী দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায়ে তার দূতিয়ালিও এই প্রেক্ষিতে খানিকটা হোঁচট খায়। অন্যভাবে বললে- ব্যাপারটা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন তিনি। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে বাংলাদেশ রেডিও এবং বিভিন্ন বার্তাসংস্থার টিকার সার্ভিসই (গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের সংক্ষিপ্ত রূপ) ছিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খবর জানার একমাত্র মাধ্যম। মেজর ডালিমের প্রথম ঘোষণা এবং বার্তাসংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের তা হুবহু পরিবেশনকেই ভুট্টো তার ওই সম্বোধনের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন পরে। নেপথ্যের সত্যিটা পরের পোস্টে পরিষ্কার হয়ে যাবে, সেখানে বোঝা যাবে ভুট্টো আদৌ ভুল করে বলেছেন, নাকি চুক্তিটা সেরকমই হয়েছিল।

১৫ অগাস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের একটা বড় অভিযোগ ছিল মুজিব ছিলেন রুশ-ভারতের দালাল। ৬ অগাস্ট ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারের সঙ্গে আলাপে মুজিব অবশ্য ডিফেন্ড করেছিলেন নিজেকে । বলেছিলেন :

আমি মার্ক্সিস্ট না, আমি একজন সমাজতন্ত্রী তবে আমার নিজস্ব ধরনের সমাজতন্ত্রী। আমি সব দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই, কিন্তু কোনো দেশ যদি আশা করে আমি তাদের নির্দেশমতো চলবো সেটা হবে ভুল। আমি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দুইদেশেরই খুব ভালো বন্ধু হতে চাই। কিন্তু আমি রাশিয়া বা আমেরিকার দালাল হতে চাই না।

হত্যাকাণ্ডের পর ভারত ও সোভিয়েত আগ্রাসনবাদ থেকে বাংলাদেশ উদ্ধার পেয়েছে এমন একটা মতবাদের পক্ষে প্রচারণা তাই জোরালো ছিল। আর এই অক্ষ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ছিলো মার্কিন-চীন এবং ইসলামী দেশগুলোর জোরালো সমর্থন। মোশতাক ঠিক সেকথাই বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বোস্টারের সঙ্গে তার প্রথম বৈঠকে। ২০ অগাস্টের তারবার্তায় বোস্টারের বরাতে লেখা হয়েছে।

উনি বললেন এখনও তার চাহিদামতো কোনো এজেন্ডা তৈরি না হলেও ১৯৭১ সালে হারানো সুযোগটা আজ নষ্ট করা উচিত হবে না। প্রসঙ্গটা উনি মে মাসে আমাদের দুজনের এক সাক্ষাতকারে একবার উল্লেখ করেছিলেন যে কলকাতায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটা সমঝোতার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত যা ফলপ্রসূ হয়নি।

সাক্ষাৎকারের ব্যাপারগুলো পরের পোস্টে আলোচনা করা যাবে। তবে মোশতাক ও ভুট্টোর দুজনেরই উদ্যোগ এবং তৎপরতায় এটা স্পষ্ট ছিল যে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শেষ পর্বটা নতুন করে লিখতে চাচ্ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের দুই মিত্র ভারত এবং রাশিয়া এবার প্রতিপক্ষ হবে। সৌদিআরব-চীন এবং মার্কিন সহায়তায় আবার একজোট হয়ে যাবে দুই পাকিস্তান।

এই পর্যায়ে এসে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটা দারুণ সহায় হলেও, শেষ পর্যন্ত তা ঝামেলা হয়ে দাঁড়ায় নানা বিবেচনায়। প্রথমত, ভারত এ ব্যাপারে তাদের আপত্তি জানিয়ে দেয় স্পষ্টভাবেই। মুজিব হত্যাকাণ্ডসহ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে তারা কূটনৈতিক ভাষায় ‘বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা’ বলে মেনে নিতে রাজি। কিন্তু নতুন সরকারের কোনো সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে সীমান্তে আবারও শরণার্থীর ঢল নামলে তারা বসে থাকবে না। ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং ত্রাণসহায়তা পাঠানোর ব্যাপারটা সন্দেহজনক বলে জানায় তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

মোশতাকের টনক নড়ে, ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় নাম পরিবর্তনের ব্যাপারটি ঘটবে না। তবে মোশতাক যে অসহায় নন তার প্রমাণও পায় ভারত। সীমান্ত জুড়ে চীনের রণসজ্জা তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করায় যে বাংলাদেশ আক্রমণ করলে যুদ্ধটা অনেকগুলো ফ্রন্টে ছড়িয়ে যাবে। ২০ এপ্রিলের সিকিম অভ্যুত্থান কিংবা তামিলল্যান্ডে ভারতীয় সেনাদের উপস্থিতির পুনরাবৃত্তি থেকে তাই নিশ্চিত থাকে ঢাকা। অবশ্য মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিতে খুব বেশি সময় নেয়নি ভারতও। মোশতাক অবশ্য ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তন এনেছেন। বক্তৃতায় ‘জয় বাংলা’র বদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে যার শুরু। বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ নিষিদ্ধ এবং তার ছবি সব জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে টুপিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পোশাকের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া।

রাষ্ট্রীয় পোশাক নির্ধারিত হয় তার সবসময়কার পরিধেয় আচকান এবং শেরওয়ানি । ৬ অক্টোবর মন্ত্রীপরিষদে এ ঘোষণা দেওয়ার আগে নিজের মাথার টুপিটাকে টেবিলে নামিয়ে সেটার দিকে আঙুল তুলে তার মনোভাব জানান তিনি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিল- চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন সরানোর কাজে নিয়োজিত সোভিয়েত নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি নবায়নে অস্বীকৃতি। আগের বছরই চুক্তি শেষ হয়ে গেলেও তখনও তারা চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যায়নি, মোশতাক তাদের যেতে বাধ্য করলেন।

২৬ আগস্ট ভুট্টোকে পাঠানো তার চিঠি প্রকাশিত হয় পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় । ভুট্টোর ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সম্বোধনের জবাবে মোশতাক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবেই নিজেকে উল্লেখ করেছেন। তবে ঘাটতিটা পুষিয়ে দিয়েছেন ইসলামী সম্বোধনে। ‘আসসালামু আলাইকুম’ দিয়ে শুরু সে চিঠিতে পাকিস্তানের সঙ্গে আবার আগের মতো সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশের জনগণ যে মুখিয়ে আছে এমন মনোভাব দেখান মোশতাক। লিখেন:

ASSALAM-O-ALAIKUM:

YOUR EXCELLENCY, I HAVE THE HONOUR TO ACKNOWLEDGE RECEIPT OF YOUR EXCELLENCY’S MESSAGE CONVEYED BY THE EMBASSY OF SWITZERLAND ON AUG. 18, 1975, AS WELL AS THE MESSAGE RECEIVED THROUGH YOUR AMBASSADOR IN RANGOON. “MAY I, ON BEHALF OF THE GOVERNMENT AND PEOPLE OF BANGLADESH, GRATEFULLY ACKNOWLEDGE THE GESTURES SO SPONTANEOUSLY MADE BY THE GOVERNMENT AND PEOPLE OF PAKISTAN.

THE GOVERNMENT AND PEOPLE OF THE PEOPLE’S REPUBLIC OF BANGLADESH LOOK FORWARD WITH CONFIDENCE TO THE EARLIEST OPENING OF A NEW CHAPTER BETWEEN OUR TWO COUNTRIES, THE NORMALIZATION OF RELATIONS AND THE FORGING OF FRIENDLY AND BROTHERLY TIES BETWEEN US.”IN THE END, EXCELLENCY, I WOULD LIKE TO TRANSMIT GREETINGS FROM THE PEOPLE AND GOVERNMENT OF THE PEOPLE’S REPUBLIC OF BANGLADESH TO THE PEOPLE AND GOVERNMENT OF THE ISLAMIC REPUBLIC OF PAKISTAN.

মজার ব্যাপার হচ্ছে ঢাকা থেকে রেডিওতে এই চিঠিপত্র চালাচালির ব্যাপারে বেশ রাখঢাক রেখে খবর প্রচার করা হয়। বলা হয়, সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ হয়েছে। ভুট্টোর বার্তার ব্যাপারে জানানো হলেও উপঢৌকনের কথা চেপে যাওয়া হয়।

চমকপ্রদ ঠেকতে পারে যে, মোশতাক বাকশাল বাতিলসহ শেখ মুজিবের গৃহীত প্রচুর নীতিতে পরিবর্তন আনলেও মুক্তিযুদ্ধের চার চেতনায় হাত দেননি, কিংবা বলা যায় দেওয়ার সাহস পাননি । খুনিদের সুরক্ষার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন, স্বাধীনতাবিরোধীদের মুক্তি দিতে দালাল আইন বাতিলসহ ভুট্টোকে খুশি করার জন্য তার পদক্ষেপ কম ছিল না। ভুট্টো ধৈর্য ধরতে রাজি হলেন। হুট করে কিছু না করে নতুন সরকারকে থিতু হওয়ার সুযোগ দেওয়াটাকে তার কাছে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হলো। আপাতত জাহাজ কূটনীতি এবং দুই দেশের দূতাবাস স্থাপনের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এই জাহাজ কূটনীতি প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৭৩ সালে মুজিব খাদ্য সংকট সমাধানে তৃতীয় মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে চাল কিনেছিলেন। ১৩মে মাদ্রাজ উপকুলে ৯ হাজার ৮০০ টন চালসহ ডুবে যায় গ্রিক জাহাজ স্পাইরোস। ২২মে জানা যায়- ব্যাপারটা ছিল অন্তর্ঘাত এবং এতে জাহাজের দুই পাকিস্তানি ক্রু জড়িত। দেশে কৃত্রিম খাদ্যসংকট সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রের জন্য পাকিস্তানকে সেবার কূটনৈতিকভাবে অভিযুক্ত করেছিল ঢাকা। পাকিস্তানের জন্য বিব্রতকর ছিল ৭৪ সালের ঘটনাটি। বাংলাদেশের বন্যাদুর্গতদের জন্য ৫ হাজার ৫০০টন চাল ও ৮৯০টন কাপড় পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভুট্টো। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে প্রভাবিত করার ফন্দি বলে সন্দেহ করে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন মুজিব।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে ভুট্টোকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সৌদি আরব অভিযোগ করে , শুরুতে বললেও বাংলাদেশ এখনও নিজেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করেনি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মুসলিম দেশ, এমনকি পাকিস্তান থেকেও (বলা উচিত যে গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতাই তখন সৌদি বাদশার আতিথ্যে, তাদের নাগরিকত্ব তখনও পাকিস্তানি) ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমান’রা অভিযোগ এনেছে। তাই তারা স্বীকৃতি প্রত্যাহারের কথা ভাবছেন।

জবাবে পাকিস্তানি তরফে বলা হয়, যে ঢাকা অভ্যুত্থানে ধর্মনিরপেক্ষতাপন্থি, ভারতপন্থি এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিভক্তির পক্ষের শক্তিতে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে মাথায় রেখেও বলা যায় যে, বাংলাদেশ সরকার ধীরে ধীরে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যা ভবিষ্যতে পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের পক্ষেই যাবে। বাংলাদেশ যে ভারতের চাপেই ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দিতে পারেনি এমনটাও জানায় পাকিস্তান। এরপর সৌদি আরব রাজি হয় স্বীকৃতি প্রত্যাহার না করতে।

দু্ইদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ঘোষণা আসে ৪ অক্টোবর । নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী এবং পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী আজিজ আহমদের মধ্যে অনেকগুলো বৈঠকের পর এ ঘোষণা আসে। এতে দুই দেশের মধ্যে দুতাবাস স্থাপনের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। একইদিন ইসলামাবাদ থেকে পাঠানো তারবার্তায় বাড়তি কিছু খবর ছিল। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে ইসলামাবাদে একজন মন্ত্রীকে তার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন মোশতাক। এছাড়া করাচির এক পত্রিকায় বাংলাদেশ-পাকিস্তানের জোট (কনফেডারেশন) আসন্ন এমন এক খবরে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কথাও জানা যায়। আগের রাতে পবিত্র শব-ই ক্দর উপলক্ষ্যে এক ভাষণেও মোশতাক একই ঘোষণা দেন। সে ঘোষণায় পরের বছর অর্থাৎ ’৭৬ সালের ১৫ অগাস্ট রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান তিনি। সব ধরনের রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি ১৯৭৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দেওয়া হয়।

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বরের এক তারবার্তায় পাকিস্তানের বন্যা দুর্গত অঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের একটি মেডিকেল টিম পাঠানোর খবর জানা যায়, বন্যার খবরে মোশতাকের উদ্বেগও জানানো হয়। পাকিস্তান মেডিকেল টিমকে অপ্রয়োজনীয় মনে করলেও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তাদের গ্রহণ করতে সম্মতির কথা জানায়। একই তারবার্তায় ভুট্টোর ঘোষিত উপহার সম্পর্কে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হায়াত মেহেদি জানান, উপহারের জোগাড়যন্ত্র চলছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এই উপহার গ্রহণ করবে কিনা এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সম্মতি তাদের তরফে এখনও আসেনি।

২৩ সেপ্টেম্বরের তারবার্তায় জানা গেছে, উপহারের প্রথমভাগ জাহাজে ওঠানো হয়েছে এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে ৭ অক্টোবর তা সেখানে পৌঁছাবে। ১ অক্টোবর পাঠানো তারবার্তায় সেদিনের পাকিস্তানি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ১০ হাজার ২২০টন চাল এবং ২৩৬টন চাল নিয়ে সাফিনা-ই-ইসমাইল নামের জাহাজটি আগেরদিন চট্টগ্রাম রওয়ানা হয়েছে। এটি ১১ অক্টোবর পৌঁছাবে।

ভুট্টোর প্রতিশ্রুত বাকি উপহার নভেম্বরের মধ্যেই আরো তিন-চারটি জাহাজে বাংলাদেশে পৌঁছে যাবে। ১৯৭১ সালের পর এটি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় পাকিস্তানের প্রথম জাহাজ। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের এক কর্মকর্তাকে মার্কিন দূতাবাস থেকে মজা করে জিজ্ঞেস করা হয় যে, জাহাজটা আটক করে বাংলাদেশ এটা নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করার সম্ভাবনা কতটুকু। উত্তর আসে যে, আগে হলে সম্ভাবনা ছিল, এখন নতুন সরকার।

নভেম্বরের সেনাঅভুথ্যানের সময়টা প্রত্যাশিত উদ্বেগে কেটেছে পাকিস্তান সরকারের। এ ব্যাপারে ৮ নভেম্বর মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো তারবার্তায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্বপদে ফিরে আসায় স্বস্তির আভাসে মিলেছে ভুট্টোর তরফে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুথানে যে ভারতের হাত ছিল না সেটা তিনি অবিশ্বাস করেননি। তবে খালেদের ব্যাপারে পাকিস্তানিদের অস্বস্তিটা ছিল পরিষ্কার কারণ তাদের পররাষ্ট্রদপ্তরের চোখে তিনি রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একজন জেনারেল, যা পেশাদার জিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিচারপতি সায়েমকে প্রধান সামরিক আইনপ্রশাসক রেখে জিয়াকে তার অধীনস্ত করার সম্ভাব্য কারণটি জানতে চান ভুট্টো। রাষ্ট্রদূত বাইরোড উত্তরে বলেন, একজন বেসামরিক বিচারপতির অধীনে সামরিক বাহিনীর থাকাটা আগামী দিনগুলোর জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ। সংঘাতটা আগামীতে আরো বাড়তে পারে কিনা ভুট্টোর এই আশঙ্কার জবাবে বাইরোডের মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ: তেমন কোনো সম্ভাবনার খবর এখনও আমরা পাইনি। নৌ এবং বিমান বাহিনী রহমানের (জিয়া) এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গেই আছে, আর মুক্তিবাহিনীর (!) অবস্থা ছিন্নভিন্ন, তারা সামরিক বাহিনীর অধীনেই আছে।

ঢাকার বাইরে সেনানিবাসগুলোতে খালেদ মোশাররফের প্রতি অনুগত বা তার মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ এমন কোনও সেনা ইউনিট আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে বাইরোড ভুট্টোকে নিশ্চিন্ত করে বলেন- তেমন কোনো খবর এখনও আমরা পাইনি।

তবে ভুট্টোর স্বপ্নটা জিয়ার হাতেও পূর্ণতা পায়নি। ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিষয়ে কোনো ঘোষণা তিনিও দেননি। এ ব্যাপারে এয়ার ভাইস মার্শাল তোয়াব এবং কর্নেল ফারুক রশীদরা পরের বছর মে পর্যন্ত তুমুল চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন। লিবিয়ার আনুকূল্যে তাদের অভ্যুথান প্রচেষ্টা সেনাবাহিনীতে তেমন পাত্তা পায়নি। ১৫ অগাস্টের হোতাদের একজন লে.কর্নেল রশীদ তার কিছুদিন পর মার্কিন সাংবাদিক লুই সিমন্সকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে সখেদে জানান, জিয়া তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন। রশীদ বলেন :

THERE WAS A GROWING DIFFERENCE BETWEEN ZIA AND TAWAB,” HE SAID. “TAWAB WANTED TO HAVE BANGLADESH DECLARED AN ISLAMIC REPUBLIC AND UNITE FIRMLY WITH OTHER ISLAMIC STATES FOR FINANCIAL AND MORAL SUPPORT”-AN ANTI-INDIAN MOVE.

ZIA WAS STRONGLY OPPOSED TO THIS, RASHID SAID, ADDING THAT ZIA IS GRADUALLY DROPPING THE ANTI-INDIAN POSTURE WITH WHICH HE TOOK CONTROL OF BANGLADESH FOLLOWING A BLOODY ARMED MUTINY IN DACCA NOV. 7. RASHID SAID THAT AT ONE POINT DURING HIS CONVERSATION WITH ZIA, THE GENERAL TOLD HIM THAT BANGLADESH COULD NOT SURVIVE IF IT CONTINUED TO BE ANTI-INDIAN.

ভারতের বিরোধিতা করে টেকা যাবে না জিয়ার এই উপলব্ধির পেছনে সঙ্গত কারণ ছিল। সেটা অন্য কোনও লেখায় আলোচনা করা যাবে। তবে বাংলাদেশের ইসলামী করণে মোশতাকের অসম্পূর্ণ কাজগুলো জিয়া দক্ষ হাতেই সেরেছেন রাজনীতিতে নেমে, রাষ্ট্রপতি হয়ে। তার প্রতি ভুট্টোর শুভেচ্ছার প্রথম উপহারটিও ছিল বেশ দামী- একটি ৭০৭ বোয়িং বিমান। ’৭৬ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতা বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে এটি ছিল তার ‘মুসলিম ভাই’দের জন্য ভুট্টোর আরেকটি নজরানা।


সুত্রঃ BdNews

 

শুভ জন্মদিন অভিজিৎ রায়।

 শুভ জন্মদিন অভিজিৎ রায়।🙏

.
বাংলাদেশে বিজ্ঞান মনস্ক লেখকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। মুক্তচিন্তা, মানবতাবোধ আর বিজ্ঞান ছিলো তাঁর অনন্ত পথযাত্রা। লেখায় আঘাত করতে চেয়েছিলেন ধর্মান্ধতা কে, কোন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। নিজের লেখায় খুলে দিয়েছিলেন সমাজের চিরচেনা মুখোশ।
.
আজীবন তিনি ছিলেন মনবতাবাদী‌।
যদিও তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু বলতেন,
.



"আমি নাস্তিক। কিন্তু আমার আশে পাশের বহু কাছের মানুষজন বন্ধু বান্ধবই মুসলিম। তাদের উপর আমার কোন রাগ নেই, নেই কোন ঘৃণা। তাদের আনন্দের দিনে আমিও আনন্দিত হই। তাদের উপর নিপীড়ন হলে আমিও বেদনার্ত হই। প্যালেস্টাইনে বা কাশ্মীরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার হলে তাদের পাশে দাঁড়াতে কার্পণ্য বোধ করি না। অতীতেও দাঁড়িয়েছি, ভবিষ্যতেও দাঁড়াবো। এটাই আমার মানবতার শিক্ষা।"
.
পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী । কিন্তু তাঁর নেশা ছিলো ব্লগ আর বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখিতে। তিনি মোট ১০টি বই প্রকাশ করেন। বিজ্ঞান, নাস্তিকতাবাদ, বাস্তববাদ, সন্দেহবাদ ও যৌক্তিকতার ওপর ভিত্তি করে রচিত অবিশ্বাসের দর্শন এবং বিশ্বাসের ভাইরাস।
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে, স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, সমকামিতা: একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান, অবিশ্বাসের দর্শন, বিশ্বাস ও বিজ্ঞান,শূন্য থেকে মহাবিশ্ব , কিংবা বিশ্বাসের ভাইরাস‌। কি অসামান্য তাঁর যুক্তি বুদ্ধি, বিজ্ঞানভিত্তিক মতামত। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে লিখেছিলেন :
ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে।
.
বাংলাদেশে আমাদের মাঝে, কেঁচোর মতো অজস্র মেরুদণ্ডহীন উগ্রবাদীর বসবাস। যারা ভয়ে গর্তে সিধিয়ে পড়ি, বিপদ দেখলে লুকিয়ে বাঁচি। অথচ তাঁর অভ্যাস ছিলো স্রোতের বিপরীতে চলে সত্য জানান দেয়া। যা তাঁর "অবিশ্বাসের দর্শন" এবং "বিশ্বাসের ভাইরাস" বই পড়লে বোঝা যায়। কিন্তু জবাবে তাঁর উপর এলো চাপাতির কোপ। যারা লেখার বদলে বদলা নেয় চাপাতির কোপে।
.
তাঁকে বোঝার সামর্থ্য এই উগ্রবাদীদের হয়নি কখনো হবেনা। তাঁকে বোঝার যোগ্যতা এই অজ্ঞ হিংস্র জীবদের কখনোই হবেনা। বাংলাদেশ ছিলো তাঁর ভীষণ প্রিয়। প্রতিবছরই আমেরিকা থেকে ছুটে আসতেন কেবলই মাতৃভূমির টানে। সেই মাতৃভূমিতে, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বইমেলার ধারেই তাঁকে খুন হতে হলো চাপাতির কোপে। এরচেয়ে ভয়াবহতা আর কি হতে পারে?
.
ধর্মান্ধ আর উগ্রবাদী দেশে গোবরে পদ্মফুল হয়ে জন্মেছিলেন তিনি। উলুবনে মুক্তা ছড়াতে চেয়েছিলেন। বিপরীতে কি হলো...!
তাঁর বইয়ের নামের মতোই তিনিও আলো হাতে চললেন আঁধারের যাত্রী হয়ে।
.
অভিজিৎ রায়ের জন্ম হয়েছিলো আসামের শিবনগরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। তাঁর
গর্ভবতী মাকে ভারতের আসামে রেখে বাবা অজয় রায় অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। আসামের শিবনগরের নাজিরা ম্যাটারনিটি সেন্টারে জন্ম হয়েছিলো তাঁর।
.
মূলত বাবার হাতেই তাঁর মুক্তচিন্তার হাতেখড়ি। লিখেছিলেন নিজেই-

"বাবা আমাকে ‘রাজপুত্রে’র মত বড় করতে পারেননি বটে, কিন্তু বাবাই আমাকে যত রাজ্যের বইয়ের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের শেলফে হাজারো বইয়ের পাশাপাশি ছিলো মুক্তধারার কিশোর –বিজ্ঞানের মজার মজার সমস্ত বই। জাফর ইকবালের ‘মহাকাশে মহাত্রাশ’ কিংবা স্বপন কুমার গায়েনের ‘স্বাতীর কীর্তি’ কিংবা ‘বার্ণাডের তারা’ এগুলো তার কল্যানেই পড়া। বাবাই আমাকে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সুকুমার রায়ের রচনা সমগ্র। হযবরল-এর বিড়াল, পাগলা দাশু আর হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রীর কথা জেনেছি তার কাছ থেকেই। বাবাই আমার মনে বপন করেছিলেন মুক্তবুদ্ধি আর সংশয়ের প্রথম বীজ। বাবাই আমাকে আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন রবিঠাকুরের প্রশ্ন কবিতা ।"
যে পথে থাকে পদে পদে ভয়, সে পথে ঝুঁকি সত্ত্বেও তিনি এগিয়েছেন দৃঢ়চিত্তে। তাইতো তিনি থাকবেন মহাকালের বুকে নক্ষত্র রূপে।

.
আজ অভিজিৎ রায়ের জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধা অভিজিৎ রায়ের প্রতি। 🙏💕

Monday, August 17, 2020

চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে একটি শিক্ষণীয় গল্পঃ

 এক দেশে ছিলো এক পিপড়া। সে প্রতিদিন ৮ টায় অফিসে ঢুকতো। তারপর কারো সঙ্গে সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে কাজে বসে যেত। সে যে পরিমাণ কাজ করত, তাতে কোম্পানির উৎপাদন হতো প্রচুর এবং এর ফলে সে আনন্দের সঙ্গেই জীবন নির্বাহ করত।

ওই অফিসের সিইও সিংহ অবাক হয়ে দেখত, এই পিঁপড়াটি কোনো ধরনের সুপারভিশন ছাড়াই প্রচুর কাজ করছে। সিংহ ভাবল, পিঁপড়াকে যদি কারও সুপারভিশনে দেওয়া হয়, তাহলে সে আরও বেশি কাজ করতে পারবে।
কয়েক দিনের মধ্যেই সিংহ একটি তেলাপোকাকে পিঁপড়ার সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দিল। সুপারভাইজার হিসেবে এই তেলাপোকাটির ছিল দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, আর সে দুর্দান্ত রিপোর্ট লিখতে পারত।

তেলাপোকাটি প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিল, এই অফিসে একটি অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম থাকা উচিত। কয়েক দিনের মধ্যেই তেলাপোকার মনে হলো, তার একজন সেক্রেটারি দরকার, যে তাকে রিপোর্ট লিখতে সাহায্য করবে। … সে একটা মাকড়সাকে নিয়োগ দিল এই কাজে যে সব ফোনকল মনিটর করবে, আর নথিপত্র রাখবে।

সিংহ খুব আনন্দ নিয়ে দেখল যে তেলাপোকা তাকে প্রতিদিনের কাজের হিসাব দিচ্ছে আর সেগুলো বিশ্লেষণ করছে গ্রাফের মাধ্যমে। ফলে খুব সহজেই উৎপাদনের ধারা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাচ্ছে এবং সিংহ সেগুলো বোর্ড মিটিংয়ে ‘প্রেজেন্টেশন’ আকারে পেশ করে বাহবা পাচ্ছে।

কিছুদিনের মধ্যেই তেলাপোকার একটি কম্পিউটার ও লেজার প্রিন্টার প্রয়োজন হলো এবং এগুলো দেখভালের জন্য আইটি ডিপার্টমেন্ট গঠন করল। আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পেল মাছি।

আমাদের কর্মী পিঁপড়া, যে প্রতিদিন অফিসে এসে প্রচুর কাজ করে মনের সুখে গান গাইতে গাইতে বাসায় ফিরত, তাকে এখন প্রচুর পেপার ওয়ার্ক করতে হয়, সপ্তাহের চার দিনই নানা মিটিংয়ে হাজিরা দিতে হয়।

নিত্যদিন এসব ঝামেলার কারণে কাজে ব্যাঘাত ঘটায় উৎপাদন কমতে লাগল, আর সে বিরক্ত হতে লাগল। সিংহ সিদ্ধান্ত নিল, পিঁপড়া যে বিভাগে কাজ করে, সেটাকে একটা আলাদা ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করে সেটার একজন ডিপার্টমেন্ট প্রধান নিয়োগ দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।

সিংহ ঝিঁঝিপোকাকে ওই ডিপার্টমেন্টের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিল। ঝিঁঝিপোকা প্রথম দিন এসেই তার রুমের জন্য একটা আরামদায়ক কার্পেট ও চেয়ারের অর্ডার দিল।
কয়েক দিনের মধ্যেই অফিসের জন্য স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করতে ঝিঁঝি পোকার একটি কম্পিউটার ও ব্যক্তিগত সহকারীর প্রয়োজন হলো। কম্পিউটার নতুন কেনা হলেও ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে ঝিঁঝিপোকা নিয়োগ দিল তার পুরোনো অফিসের একজনকে।

পিঁপড়া যেখানে কাজ করে, সেখানে আগে ছিল চমৎকার একটা পরিবেশ। এখন সেখানে কেউ কথা বলে না, হাসে না। সবাই খুব মনমরা হয়ে কাজ করে। ঝিঁঝিপোকা পরিস্থিতি উন্নয়নে সিংহকে বোঝাল, ‘অফিসে কাজের পরিবেশ’ শীর্ষক একটা স্টাডি খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। পর্যালোচনা করে সিংহ দেখতে পেল, পিঁপড়ার বিভাগে উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

কাজেই সিংহ কয়েক দিনের মধ্যেই স্বনামখ্যাত কনসালট্যান্ট পেঁচাকে অডিট রিপোর্ট এবং উৎপাদন বাড়ানোর উপায় বাতলে দেওয়ার জন্য নিয়োগ দিল। পেঁচা তিন মাস পিঁপড়ার ডিপার্টমেন্ট মনিটর করল, সবার সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলল। তারপর বেশ মোটাসোটা একটা রিপোর্ট পেশ করল সিংহের কাছে। ওই রিপোর্টের সারমর্ম হলো, এই অফিসে প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী বেশি। কর্মী ছাঁটাই করা হোক।

পরের সপ্তাহেই বেশ কয়েকজন কর্মী ছাঁটাই করা হলো। বলুন তো, কে সর্বপ্রথম চাকরি হারাল? ওই হতভাগ্য পিঁপড়া। কারণ, পেঁচার রিপোর্টে লেখা ছিল, ‘এই কর্মীর মোটিভেশনের ব্যাপক অভাব রয়েছে এবং সর্বদাই নেতিবাচক আচরণ করছে, যা অফিসের কর্মপরিবেশ নষ্ট করছে।

এবার ভাবুন তো, আপনার পজিশানটা কী আপনার অর্গানাইজেশনে ?

গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদের মেয়াদ বাড়লে কী হতো

 বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের নতুন নিয়োগ নিয়ে আলোচনা সম্ভবত কখনো শেষ হবে না। বিশেষ করে এক ব্যক্তির জন্য আইন বদল করার এই উদাহরণ বাংলাদেশের জন্য বিরল উদাহরণ না হলেও ব্যতিক্রম তো বটেই। এ নিয়ে প্রথম আলোয় একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম গত ২৭ জুলাই। সেই উপসম্পাদকীয়র প্রতিক্রিয়া নিয়েই এই লেখা। আগের লেখাটির নিচে লেখকের ই-মেইল ঠিকানা দেওয়া ছিল। তাতে কিছু প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। অনলাইনে পাঠকেরা তাৎক্ষণিক কিছু মন্তব্য করেছেন। তবে আমার লেখার বিষয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাওয়া দুটি টেলিফোন।

প্রথম টেলিফোনটি করেছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিক। তিনি নিজেই একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ গভর্নর ও সবচেয়ে ভদ্রলোক গভর্নর নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু মতামত আছে। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্যেই তিনি পুরোনো একটি ঘটনার কথা বললেন। সেটি এখানে বলা যাক।

ফখরুদ্দীন আহমদ তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশৃঙ্খলা করার দায়ে তিনি ১০ জন সিবিএ নেতাকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। চাকরিচ্যুত ব্যক্তিরা সবাই ক্ষমতাসীন দলটির নেতা-কর্মী। আবদুল মান্নান ভূঁইয়া তখন বিএনপির মহাসচিব। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি হলো। কিন্তু গভর্নর অবিচল, তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। গল্পের শেষটা হলো: একদিন ফখরুদ্দীন আহমদকে ডাকলেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বললেন, রাজনীতি করতে হয় সবাইকে নিয়ে। দলের মত মানতে হয়। তিনি যেন চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের কিছু লঘু শাস্তি দিয়ে আবার স্বপদে বহাল করেন। তখন ফখরুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, তাঁর কথা অনুযায়ী সবাই যাঁর যাঁর পদে চাকরি ফিরে পাবেন। অফিসে ফিরে আজই আদেশ জারি করবেন, তবে তিনি নিজে আর পরের দিন থেকে আসবেন না। এ কথার পরে প্রধানমন্ত্রী আর কিছু বলেননি। ফখরুদ্দীন আহমদ মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত গভর্নর পদে বহাল ছিলেন।

গল্পের প্রথম অংশ নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। কারণ, ঘটনাটি সে সময় যথেষ্ট প্রচার পেয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশৃঙ্খলা ও গভর্নরের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে তৎকালীন বিএনপি-সমর্থিত অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সিবিএর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয় ৩০ অক্টোবর। তাঁরা আর চাকরি ফিরে পাননি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎপর্বের সত্যতা বলতে পারবেন একমাত্র তাঁরাই। তবে এই গল্প এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রচলিত আছে।

দ্বিতীয় ফোনটি পাই লেখা ছাপা হওয়ার পরের দিন। এবারের ফোনদাতা একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন। সাবেক ও প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সচিবালয়ে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর বলা ঘটনাটি ফখরুদ্দীন আহমদকে নিয়েই। তার আগে বলে রাখি, গভর্নরের মেয়াদ বাড়ছে—এই তথ্য নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরেই কাজ করছিলেন প্রথম আলোয় আমার সহকর্মী ফখরুল ইসলাম। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে জানতে পারেন, এম সাইফুর রহমানও তাঁর সময়ের গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলামের মেয়াদ বাড়াতে মন্ত্রিপরিষদে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা সেই অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু টেলিফোনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই সাবেক কর্মকর্তাটি জানালেন ভিন্ন একটি তথ্য। তিনি বললেন, এম সাইফুর রহমান ফখরুদ্দীন আহমদের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা উত্থাপন করেননি, প্রস্তাবটি ফিরিয়ে আনেন।

কেন ফিরিয়ে আনেন? প্রথম ঘটনাটির সঙ্গে এর কিছুটা সংশ্লিষ্টতা আছে। সিবিএ নেতাদের চাকরিচ্যুতির ঘটনায় দলের মধ্যে একটি অংশ বিক্ষুব্ধ ছিল। নতুন করে বিরোধিতায় নামেন ব্যাংকের মালিকানা আছে, মন্ত্রিসভার এমন কয়েকজন সদস্য। এর মধ্যে তিনি বিশেষ করে বললেন এম মোরশেদ খান ও মির্জা আব্বাসের কথা। তাঁরা এর বিরোধিতা করে পাল্টা লবি শুরু করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কথায় এম সাইফুর রহমান মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ থেকে প্রত্যাহার করে নেন। নইলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।

সিনেমায় গল্প বলার নানান রীতি আছে। একসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা এগিয়ে যায়, শেষটি এক বিন্দুতে মিলে যায়। শুরুতে পরস্পর সম্পর্কহীন মনে হলেও শেষে দেখা যায় সব ঘটনাই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এর নাম হচ্ছে হাইপার লিংক সিনেমা। হাইপার লিংক সিনেমার রীতি প্রথম দেখা গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমায়। তবে এ জন্য বেশি বিখ্যাত মেক্সিকান পরিচালক আলেজান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু। তাঁর ‘ডেথ ট্রিলজি’: ‘অ্যামোরেস পেররোস’, ‘২১ গ্রামস’ ও ‘বাবেল’ হাইপার লিংক সিনেমার সেরা উদাহরণ।

ওপরে বলা দুটি ঘটনার একটি হাইপার লিংক কিন্তু আছে। এর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিতর্কটি জড়ানো যায়। বিএনপির নেতৃত্বের একটি অংশ ফখরুদ্দীন আহমদের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে আপত্তি করলেও বিচারপতিদের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ করার প্রস্তাবে কোনো আপত্তি দেখেননি। এ জন্য সংবিধানের সংশোধনী আনতে হয়েছিল, যা সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী নামে পরিচিত।

‘বিএনপি: সময়-অসময়’ গ্রন্থে মহিউদ্দিন আহমদ এ নিয়ে লিখেছেন, ‘পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, এ নিয়ে বিএনপি ছক কষছিল। বিএনপি সরকার সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসর নেওয়ার বয়সসীমা ৬৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে যে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার মতলবেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিচারপতি কে এম হাসানকে বিএনপির পছন্দের লোক হিসেবে প্রচার করে। এই প্রচারের সত্যতা ছিল। বিচারপতি হাসান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং এর আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সরকার তাঁকে ইরাকের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিল। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য একবার তিনি বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন।’

বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর প্রবক্তা হিসেবে তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদকে মনে করা হয়। ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র: ১৯৯১ থেকে ২০০৬’ গ্রন্থে মওদুদ আহমদ লিখেছেন, ‘বয়স বাড়ানোর এই প্রস্তাব কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক বিবেচনাধীন বিষয় ছিল না। কারণ, কোনো বিচারপতি কীভাবে পরবর্তী কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য সর্বশেষ বিচারপতি হিসেবে কত দিন বেঁচে থাকবেন, তা কারও জানার কথা নয়। পুরোপুরিভাবে জাতীয় স্বার্থে বিচার বিভাগকে জোরদার করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে কার্যকরভাবে কর্মসম্পাদনের জন্য যোগ্যতর নেতৃত্ব, মেধা ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।’

যে যা–ই যুক্তি দিক না কেন, বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর ফল মোটেই ভালো হয়নি। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, ফলাফলও ছিল খারাপ এবং বিএনপির জন্য বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। তবে আজকের আলোচনা অন্য বিষয় নিয়ে। কে এম হাসান অপারগতা প্রকাশের পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা হস্তক্ষেপে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে এই পদ ছেড়ে দিতে হলে সেই ফখরুদ্দীন আহমদই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন, যাঁর মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের মত ছিল না। আমরা সবাই জানি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি কিন্তু প্রথম পছন্দ ছিলেন না। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অপারগতা জানালে ফখরুদ্দীন আহমদ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন।

আবারও আমরা সেই হাইপার লিংক সিনেমার গল্প বলার রীতিতে ফিরে যাই। গভর্নর হিসেবে ফখরুদ্দীন আহমদ মেয়াদ শেষ করেন ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল। এম সাইফুর রহমান বয়স বাড়িয়ে মেয়াদ বৃদ্ধিতে সফল হলে ফখরুদ্দীন আহমদ ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত এই পদে থাকতেন। তাহলে কি একজন কর্মরত গভর্নর হিসেবে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর নামটি বিবেচনায় আসত? সম্ভাবনা খুবই কম।

দুই বছর বয়স বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিতে গ্রহণ এবং আরেকটি প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি না ঘটলে ইতিহাস কি অন্য রকম হতে পারত? এমন এক প্রশ্নের আসলে যার উত্তর নেই। যে যাঁর মতো উপসংহারে যেতে পারেন অবশ্য।

শওকত হোসেন: সাংবাদিক।

Monday, August 10, 2020

আপনার মতে, রামায়ণ ও মহাভারতে সবচেয়ে অবহেলিত চরিত্র কে এবং কেন?

 প্রথমে রামায়ণ প্রসঙ্গেই কথা বলব: আমার মতে, রামায়ণ সবথেকে অবহেলিত চরিত্র উর্মিলা।

লক্ষণের স্ত্রীর নাম উর্মিলা। রাজা জনকের একমাত্র** কন্যা উর্মিলা, সীতা দেবীর বোন। তার স্বামী লক্ষণ অগ্নিসাক্ষী করে তাকে বিবাহ করেছিলেন, আর্য পুত্র বৈদিক মন্ত্র পাঠ করে তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন লক্ষণ করেননি। এমনকি উর্মিলাকে বোঝার চেষ্টাও লক্ষণ করেননি।

রামের 14 বছর বনবাস হয়। সীতা, রামের সহধর্মিনী হওয়ায় রামচন্দ্রের সাথে বনে যেতে চেয়েছিলেন। স্বামীর সাথে স্ত্রীর যাবেন এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু লক্ষণও তার দাদার সাথে 14 বছরের জন্য বনবাসের শাস্তি গ্রহণ করে। এবং 14 বছরের জন্য দাম্পত্য জীবন থেকে তার স্ত্রী উর্মিলাকে বঞ্চিত করেন। উর্মিলা চেয়েছিলেন রাম লক্ষণ এবং সীতার সাথে বনবাসে যেতে। তার জন্য তিনি কাকুতি মিনতিও করেন লক্ষণ এর কাছে। কিন্তু লক্ষণ কিছুতেই রাজি হননি উর্মিলা কে সঙ্গে নিয়ে যেতে। তিনি উর্মিলা কে আদেশ করেন, যে এই 14 বছর উর্মিলা যেন একনিষ্ঠভাবে তাদের পিতা-মাতার সেবা করেন।

উর্মিলা কে অবহেলিত করা হয়েছে। রঘুনন্দন লক্ষণ একজন সূর্যবংশীয় স্বামী হিসেবে তাকে অবহেলা করেছেন। রামচন্দ্র লক্ষণ কে বনবাসে যেতে বারণ করেছিলেন কিন্তু কখনই বলেননি যে, উর্মিলার প্রতি লক্ষণের একটা দায়িত্ব আছে এবং সেই দায়িত্বটা লক্ষণ পালন করছেন না।

অভিমানী উর্মিলা এর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন নিজেকে কষ্ট দিয়ে। ওই 14 বছর সময়টায় তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন। রাজকন্যা শুতেন খড় বিছিয়ে মাটিতে। ফল ছাড়া আর কিছু আহার করতেন না।

14 বছর পর যখন রামচন্দ্র, সীতা মাতা এবং লক্ষণ চলে আসেন। তখন উর্মিলা ভঙ্গ করেন তার ব্রহ্মচর্য। সংসার করেছেন লক্ষণের সাথে। অঙ্গদ এবং ধর্মকেতু নামের দুই সন্তানের জননী হয়েছিলেন।

উর্মিলার এই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য। রাজস্থানের ভরতপুর জেলায় ১৮৭০ সালে ভরতপুর জেলার শাসক রাজা বলবন্ত সিং একটি মন্দির নির্মাণ করেন। ওই মন্দিরে উর্মিলা এবং লক্ষণের পুজো করা হয়।

মহাভারতের সবথেকে উপেক্ষিত চরিত্র বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর মতে সূর্যপুত্র কর্ণ। পথের পাঁচালী উপন্যাসে বিভূতিভূষণ ছোট্ট অপুর মুখ দিয়ে অসাধারণভবে ব্যক্ত করেছেন বীরযোদ্ধা কর্নের অবহেলার কাহিনী। ছোট্ট অপুর শিশু চোখ দিয়ে ঝরেছে বিভূতিভূষণের অশ্রু।

বিভূতি বাবুর অপরূপ, অসাধারণ, যুগান্তকারী সাহিত্যিক বর্ণনার ঊর্ধ্বে উঠে কোন কিছু লেখার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু বিভূতিবাবু বোধহয় বন্দ্যোপাধ্যায় টাইটেল থাকার জন্যই সূর্য পুত্রের প্রতি আপনার দুর্বলতা তৈরি হয়ে গেল। মাস্টারমশাই। আপনার চোখ এড়িয়ে একলব্য বাদ চলে গেল, স্যার। দেখলেন না, ওই সিডিউল ট্রাইপ ছেলেটাকে।

দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্র বিদ্যা শেখার উদ্দেশ্যে একলব্য এসেছিলেন। নিচু জাত বলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। বঞ্চিত করা হলো বিদ্যা লাভ করা থেকে। নিচু জাত আবার অস্ত্রশিক্ষা নিয়ে কি করবে, ট্যালেন্ট যদি থাকে তাহলেও সেই ট্যালেন্টএর মূল্য কি? ওদের কোদাল চালানো শেখা প্রয়োজন। দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা নেবেন রাজপুত্ররা। রাজা ব্যাটা রাজা হবে।

দুর দুর করে একলব্য কে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। কিন্তু একগুঁয়ে সিডিউল ট্রাইব ছেলেটা গুরু দ্রোনাচার্যের মূর্তি তৈরি করে তাকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করে ধনুর্বিদ্যা অনুশীলন করতে থাকলেন। নিষ্ঠা, তাকে ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদে পরিণত করল। চন্দ্রবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ অর্জুনকে পর্যন্ত টেক্কা দেওয়ার মতন ক্ষমতা অধিকার করলেন একলব্য।

হীরে অন্ধকারেও চকচক করে। প্রতিভা লুকিয়ে থাকে না। ধরা পরে গেলেন একলব্য। পড়বি তো পড় দ্রোণাচার্যের সামনেই।

-কিভাবে শিখলে এই ধনুর্বিদ্যা? কে তোমার গুরু?

অরণ্য প্রকৃতির কোলে থাকা সহজ সরল ছেলে একলব্য। ধনুর্বিদ্যা তে সে অনেক অনেক পারদর্শী, কিন্তু কুটকাচালি, কূটনীতি সে বোঝেনা। সরল ভাষায় উত্তর দিল-

"গুরু দ্রোণাচার্য আপনি আমার গুরুদেব। আপনি প্রত্যাখ্যান করার পর, আমি আপনার মূর্তি তৈরি করে, তার সামনে ধনুর্বিদ্যা অনুশীলন করেছি এবং আপনার আশীর্বাদে আমি আজ সফল হতে পেরেছি।"

দ্রোণাচার্য খুব ভালো মতনই জানতেন যে তার মাটির পুতুলটা হয়তো একলব্যের মধ্যে কনফিডেন্স গ্রো করেছে। কিন্তু ধনুর্বিদ্যায় একলব্য পারদর্শিতা অর্জন করেছেন অনুশীলনের মাধ্যমে। যার কোন বিকল্প হয় না।

রাজার ব্যাটাই রাজা হবে।

গুরু দ্রণ তার জীবিকা নির্বাহন কারী ধনুক বান পাশে সরিয়ে রাখলেন। একলব্য এর কাছে এগিয়ে গেলেন। অহংকারী ক্রুদ্ধ গলায় বললেন-

কাউকে না জানিয়ে তার জিনিস গ্রহণ করাকে চুরি বলা হয়, একলব্য।

-চুরি?!

- চুরি! চুরি! হ্যাঁ একে চুরি বলা হয়। একলব্য।

চুরির অপবাদ শুনে ভয় পেয়ে গেলেন একলব্য। এই ভয়টা ওদের আছে। এখনো এই ভয়টা ওদের আছে। দেখবেন মাত্র 10 হাজার টাকা ঋণ শোধ করতে না পারার জন্য একজন কৃষক গলায় দড়ি দেয়। ওদিকে 10 লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে নিয়েও বুক বাজে বিদেশে চলে যায়, রাজার বেটা রাজা।

একলব্য কে একটু ভয় দেখানোটাই দ্রোণাচার্যের উদ্দেশ্য ছিল। এবার উনি আসল প্রসঙ্গে আসলেন। বললেন-.তুমি যে আমার কাছ থেকে এত সুন্দর ধনুর্বিদ্যা শিখে বিশ্বের সেরা ধনুর্ধর এ পরিণত হলে তার জন্য আমাকে গুরুদক্ষিণা দেবে না?

চমকের ওপর চমক। বিপুল সম্পদের অধিকারী রাজগুরু দ্রোণাচার্যকে কি গুরুদক্ষিণা দিতে পারে এক সাধারণ সিডিউল ট্রায়প ছেলে? কিবা আছে এদের কাছে? কি বা পেয়েছে এরা? দু'মুঠো ভাত জোগাড় করতেই তো কেটে যায় সারাবেলা কি দেবে একলব্য, গুরু দ্রোণাচার্যকে?

কেন?

আত্মত্যাগ, বড় হবার স্বপ্ন, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ইচ্ছে, আর রাজার ব্যাটাকে রাজা করার প্রজাতান্ত্রিক মর্যাদা!

গুরু দ্রোণাচার্য সেদিন যদি একলব্যের প্রাণ চাইতেন তাহলে হয়তো তার ওপর একটু হলেও করুনা করা হত। দ্রোণাচার্য একলব্য এর কাছে চাইলেন। তার ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল।

মহাভারতে লেখা নেই। কিন্তু আমি জানি, সেদিন একলব্য চোখের জল ফেলেনি। কারণ হাজার হাজার বছর ধরে আত্মত্যাগ করতে করতে ওদের ডিএনএ গুলো চোখকে কাঁদতে বলার প্রোগ্রামিং মুছে দিয়েছে।

রাজার ব্যাটাই রাজা হল

একলব্য তার।কোমর থেকে তরোয়াল টা কে বার করে। তার ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল টা কেটে গুরুদক্ষিণা হিসেবে দিয়ে দিলেন চন্দ্রবংশের স্বনামধন্য গুরু দ্রোণাচার্য কে।

রাজার ছেলে রাজা হবেই

এখন বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতবর্ষে খেলার জন্য শ্রেষ্ঠ কোচকে দেওয়া হয় দ্রনাচার্য পুরস্কার। শ্রেষ্ঠ খেলোয়ারদের দেওয়া হয় অর্জুন পুরস্কার।

আমি জানিনা। তবে আমার মনে হয় ওই অনুষ্ঠান গুলি একলব্যরাও দেখে টিভির পর্দা দিয়ে। দাঁতে দাঁত চিপে তারা বিড়বিড় করতে করতে সেই সময় বলে- 'এবার রাজার ছেলে আর রাজা হবে না। রাজা সেই হবে যে রাজা হবার যোগ্য"।


মহাভারত এ অবহেলিত চরিত্র একাধিক রয়েছে। যেমন একাধিক চরিত্রের সহাবস্থান হয়েছে এই কাব্যে, সেরকম ভাবেই একাধিক চরিত্র তার প্রাপ্য সম্মান পায়ে নি বা ধরে নেওয়া যেতে পারে এই কাব্যের রচয়িতা বা রচয়িতারা সকলেই একই পথ অনুসরণ করেছেন।

১.যেমন অবহেলিত চরিত্র বলতে প্রথমেই সবার অঙ্গ রাজা কর্ণের কথা মনে হয়। সত্যিই সে অবহেলিত চরিত্র যদিও তাঁর চারিত্রিক কিছু দোষের উল্লেখ আমরা মহাভারতে পাই কিন্তু তিনি সূর্য পুত্র হলেও তাঁকে কিন্তু দেবতার চরিত্র বলে মহাভারতে বলা হয় নি। বলা হয়েছে একজন মানুষ হিসাবে, আর মানুষ হিসাবে তার মধ্যে দোষ আর গুণ দুটোই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর দোষের থেকে তার প্রতি অনাচার আর অবহেলার ছবিটাই যেন বেশি স্পষ্ট তাঁর জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত।

২. হিরিম্বা হলো আর এক অবহেলিত চরিত্র। দাদা হিরিম্ব এর কথায় পঞ্চপান্ডব কে মেরে খাবার জন্য হিরিম্বা সেখানে পৌঁছে একমাত্র জাগ্রত ও পাহারারত ভীষন দেহী ভীম কে দেখে তাঁর প্রেমে পরে গেলেন এবং বিবাহ প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। শেষে কিনা যুদীষ্ঠির এর কথায় ভীম বিবাহে রাজী হলেন এবং বিনিময় হিরিম্বা নিজের দাদাকে ভীম এর হাতে মরতে দিলেন। সেই বিবাহও ছিল কিন্তু শর্তসাপক্ষ। তবুও সে কিন্তু ভীমের পত্নী হবার যোগ্য প্রাপ্য পেলেন না, যেমনটা দ্রৌপদী পেলেন। যদিও দ্রৌপদীকে কিন্তু ভীম অর্জন করেননি করেছিলেন অর্জুন আর ভীম হিরিম্বাকে তাঁর দাদা হিরিম্ব কে লড়াইতে পরাস্ত করে।

৩. এবার হিরিম্বাপূত্র ঘটোৎকচের কথায়ে আসি। পিতা ভীম এর মতো অসীম সাহসী এবং পিতা ভীম এর ন্যায় অসীম দৈহিক বল ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এই ঘটোৎকচ। কিন্তু তিনিও কিন্তু তাঁর মায়ের মতো যোগ্য সম্মান পেলেন না। সেটা কি কেবলমাত্র সে তাঁর মায়ের মতো অনার্য ছিলেন তাই? তার উপর তাঁকে কিনা ব্যবহার করা হলো যুদ্ধে বলির স্বরূপ হিসাবে। যাতে কিনা সেই অভাগা কর্ণ তাঁর ইন্দ্রের দেওয়া বাসব শক্তির প্রয়োগ তাঁর উপর করে এবং হত্যা করে। শুধুমাত্র অর্জুন কে কর্ণের হাত থেকে বাঁচাতে ঘটোতকচ কে বলি দেওয়া হলো।

৪. কৌরব আর পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু কৃপাচার্য এর কথায় আসি। মহাভারতে দ্রোণাচার্য এর আগে কৃপাচার্য এর একটা সম্মানিত স্থান ছিল কৌরব বংশে। কিন্তু দ্রোণাচার্য আসবার পর থেকে কৃপাচার্যকে যেন ইচ্ছা করেই অনেক পিচ্ছনে ঠেলে দেওয়া হলো। সব স্থানেই আছেন কিন্তু যেন সেরকম কোনো ভূমিকাই নেই। সব সম্মান দ্রোণাচার্য নিয়ে গেলেন। যদিও ভীষ্ম কৃপাচার্যকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় মহারথী বলে সম্মানিত করেছিলেন কিন্তু নিজের বীরত্ব দেখাবার সেরকম জায়গা তিনি পেলেন না। সেটার কারণ তাঁর পাণ্ডব প্রীতি হতেও পারে।

৫. অর্জুনের চার পত্নী (দ্রৌপদী, উলুপী, চিত্রাঙ্গদা ও সুভদ্রা)। এরমধ্যে কেবল মাত্র দ্রৌপদী এবং সুভদ্রা ছাড়া বাকি দুজন কিন্তু মহাভারতে হঠাৎ দেখা উল্কাপাত এর মত আবির্ভাব হয়েই মিলিয়ে গেছে। অথচ এদের দুইজনেরই অর্জুন এর পত্নী হবার যোগ্য সন্মান পাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু ঘটনার বিবর্তন এনাদেরকেও অবহেলা করেছেন। অথচ উলুপির পুত্র ইরাবান কিন্তু অর্জুনের পুত্র হবার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পাণ্ডব পক্ষে যথার্থ যুদ্ধ করে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছেন আবার চিত্রাঙ্গদা র পুত্র বভ্রুবাহণ কর্তৃক অর্জুন কিন্তু পরিশেষে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করেছেন।

৬. এবার আসি দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রের কথায়। প্রতিবিন্ধ‍্য, সুতসোম, শ্রুতকর্মা, শতানীক ও শ্রুতসেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষদিন পর্যন্ত বীরের মত যুদ্ধ করেছেন এই পাঁচ ভাই নিজেদের পিতাদের পাশে দাড়িয়ে আর শেষে কিনা এই পাঁচ বীর যোদ্ধাকে রাত্রে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র অবস্থায় অশ্বত্থামা র হাতে মরতে হলো।

৭. এবার আসি এক শিশুশিল্পী র কথায়। একলব্য । মনেহয় মহাভারতের রচয়িতারা এনাকে ইচ্ছা করেই মনে রাখতে চাননি। যেন একটা অভিশাপ এনাকে মনেরাখা। যিনি কেবলমাত্র গুরুর মূর্তি নিজে হাতে গড়ে তার সম্মুখে ধনুর বান এর অভ্যাস করে এমন কীর্তির ছাপ রেখেছিলেন যে স্বয়ং অর্জুন ভয় পেয়ে তাঁর গুরুকে ভর্ৎসনা করেছিলেন। ফলে গুরুদক্ষিণা বাবদ একলব্য এর বৃদ্ধাঙ্গুলি টি কাটা পড়েছিল। ব্যাস অকেজো করে দেওয়া হলো এক প্রচন্ড প্রতিভা কে। বিভিন্ন জায়গাতেই দেখি সবাই কর্ণ আর অর্জুন এর তুলনা করেন কই কেউ তো একলব্য এর সাথে এদের তুলনা করেন না। আসলে সবাই জানে কে প্রকৃত ধনুর্বিদ। তাই মহাভারতের রচয়িতারা একলব্য কে চরম অবহেলা করলেও পাঠকগণ কিন্তু ওই Guest Apperance চরিত্রটিকে আজীবন মনে রেখেছেন তারা কিন্তু অবহেলা করেননি।

৮. শেষে আসি ভীষ্মের কথায়। সারা জীবনের সমস্ত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করলেন অন্যের কথা ভেবে। পিতা শান্তনুর দ্বিতীয় বিবাহের কথা ভেবে এবং সেইমত সত্যবতীর বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজে বিবাহ করলেন না সারাজীবন একা কাটালেন। এরপর শান্তনুর মৃত্যুর পরেও সিংহাসন এ বসলেন না বরঞ্চ দুই ভাই চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্র বীর্য এর শিশুকাল এ তাদের হয়ে রাজ্য শাসন করলেন। বিচিত্রবীর্য এর জন্য কাশী র সয়ম্ভর সভা থেকে তিন বোনকে ক্ষত্রিয় নিয়ম অনুযায়ী হরণ করে আনলেন আবার ধৃতরাষ্ট্র, পান্ডু ও বিদুর বড়ো না হওয়া পর্যন্ত তাদের হয়ে আবার রাজ্য শাসন করলেন। কিন্তু একবারও সিংহাসন পেলেন না বা রাজার মর্যাদা পেলেন না। এরপর চোখের সামনে কৌরব দের দুষ্ট কীর্তি আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হতে দেখতে লাগলেন কিন্তু তাঁর মতপ্রকাশের কোনো স্বাধীনতা পেলেন না বা তাঁর কথা কেউ শুনলেন না। এরপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের হয়ে লড়াই করে নিজের কর্তব্য পালন করলেন, নিজে অপরাজেও জেনেও পাণ্ডবদের কাছে শিখণ্ডী র রহস্য ফাঁস করে দিলেন এবং তাঁকে পরাজিত করার রাস্তাও বলে দিলেন। সবথেকে পণ্ডিত, বেদজ্ঞ ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োগে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না, সমগ্র কৌরব বংশের এবং মহাভারতের মেরুদণ্ড ভীষ্মের প্রতি কিন্তু মহাভারত কাহিনী চরম অবহেলাই করেছেন।

এছাড়াও আরো ছোট বড় অনেক চরিত্র মহাভারতে তাঁদের কীর্তির ছাপ রেখে গেছেন। এবং ইনারা প্রত্যেকেই কিন্তু এই কাহিনীকে সম্পূর্ণতা দান করেছেন। কিন্তু আমরা সবাই শেষে ওই হাতেগোনা কয়েকজন কেই মনে রাখি। বাকিদের প্রতি কিন্তু অবহেলাই করি। তাই না?

এটা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কতগুলো মানুষের সাথে আমাদের যুক্ত হতে হয় এবং এনারা প্রত্যেকেই আমাদের জীবন ও চিন্তন গঠনের জন্য কম বেশি দায়ী থাকে কিন্তু একটা সময় পর কতজন কে আমাদের গভীর চিন্তার জগতে সমান অধিকার দিতে পারি? মহাভারত তার ব্যাতিক্রম কিছু নয়। কথায় আছে যা নেই মহাভারতে, তা নেই ভু-ভারতে।

Wednesday, August 5, 2020

মায়ের_যৌনাঙ্গের_ছবিগুলো_ও_মান্টো

মান্টো মোবাইলফোনের স্ক্রিন স্ক্রল করে করে তার মায়ের যৌনাঙ্গের ছবিগুলো দেখছিল। কিছুক্ষণ পরেই মা এসে তার পাশে দাঁড়ালেন এবং তার হাত থেকে ছোঁ মেরে মোবাইলফোনটি নিয়ে নিলেন। গালে চটাস করে চর বসিয়ে বললেন, "কী দেখছিস"।

মান্টোর কোন ভাবলেস হলোনা। সে খুব ধীরে ধীরে মাথাটা ঘুরিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকালো। তারপর চোখটা নামিয়ে বললো, "এই পথেইতো পৃথিবীতে এসছি মা। ওরাওতো এমন'ই পথের শেষে পৃথিবীর আলো দেখেছিল, যারা ছবিগুলো আমায় পাঠিয়েছে"। এই যে বুক তোমার, আমার ক্ষুধার কলশ, তোমার পেটের পেলবতা, আমার মিষ্টি বালুস। আমি তো এর বাইরে কোনদিন ঘুমাই নি।"

"আমার কাছে আর কী লুকোবে মা"।

মা দৌড়ে চলে গেলেন।

মান্টো ছিল সময়ের সবচেয়ে সুন্দর সন্তান। তার বাবা ছিলেন পঙ্গু এবং মা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা।

মায়ের বয়স তখন আটত্রিশ এবং মান্টোর বয়স তখন ঊনিশের কোঠায়। সেই দুই বছর বয়স থেকে বা তারও আগে থেকে প্রতিদিন মা তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন।

তার মনে পড়ে, কত কত মানুষ তার মায়ের দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাতো! সে চোখের ভাষাগুলো মান্টো তখনও পড়তে পারে না। সে ছিল অবোধ বাচ্চাটা। মায়ের অবোধ শিশু। এমন অনেক চোখওয়ালা পুরুষও তাকে চকোলেট সাধতো। মান্টো কখনোই তাদের সে চকোলেট ছোঁয়নি।

মা মান্টোর হাত ধরে দ্রুত পাড় হতে চাইতেন যেসব রাস্তা, যেসব রাস্তাগুলোর ছিল নির্লজ্জ এনং সুক্ষ্ম চোখ।

আসা-যাওয়ার সময় মায়ের চোখে থাকতো ঘন উদ্বেগ এবং রাস্তাগুলোর প্রতি ঘৃণা। মান্টো মায়ের চোখ বুঝতে পারতো। মা যখন ক্লাসঘরে বসে বাচ্চাদেরকে পড়াতেন তখন মান্টো চুপচাপ মায়ের পাশে বসে থাকতো। মান্টো মাকে পড়তে চেষ্টা করতো।

মা যেন এক অদ্ভূত বেঁচে থাকার লড়াই। মা যেন কাঁধে অখন্ড পাথরের ভারে নুয়ে পড়া অভিশপ্ত দেবতা সিসিফাস। মা যেন চারপাশের অসংখ্য অলৌকিক প্রেতাত্মার ভয়ে নিয়মিত অস্থির। মান্টো জানেনা, নারী মানেই ঈশ্বরের অভিশাপ, মা জানেন।

নারীকে জানেনা বলেই মাকে নিয়ে মান্টোর দিনরাত এত চিন্তাভাবনা।

স্কুল শেষে মা আর মান্টো সেইসব চোখওয়ালা পথ দিয়ে ফিরে যেতো, যেই পথের কথা একটু আগেই বলেছিলাম।

বাড়ি এসে পঙ্গু বাবার সমস্ত পোশাক আশাক পরিবর্তন করে মা তাকে গোসল করিয়ে দিতেন। বাবা নির্লিপ্তের মতো তাকিয়ে থাকতেন মায়ের মুখের দিকে। কখনও তার চোখে অবিশ্বাস, কখনও হতাশা, কখনও যেন বাবার এক বিরাট দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি মুখ মান্টোর চোখে ভেসে উঠতো।

বাবাকে খাইয়ে দিয়ে মা মান্টোকে গোসল করাতেন। তারপর মান্টোর মুখের কাছে খাবার নিয়ে এলে মান্টো মায়ের মুখের দিকে তাকাতো। মা তাকে তাড়া দেয়ার পরও মান্টো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতো। তারপর মা তার নিজের খাবার মুখে তুলে নিলে মান্টো খেতে আসতো।

মান্টোর ছিল একটিমাত্র সবুজ রঙের ঘোড়া। মান্টো তার মায়ের সাথে লুকোচুড়ি খেলার সময় ঘোড়ার পেছন হয়ে মায়ের আঁচলের তলায় লুকাতো। তারপর একটি মিষ্টি কণ্ঠী কোকিলছানার মতো বলতো, "কুক"।

মা তখন মান্টোকে খুঁজতে থাকার ভান করতো এবং মান্টো দৌড়ে এসে মায়ের কোলের উপর আছাড় খেয়ে পড়তো।

[২]

মান্টোর মামা গতকাল এসে বলে গিয়েছিলেন, মাকে তিনি খুন করবেন। মান্টোর চোখে কোন হতাশা নেই, কোন ভয় নেই। কেবল তার চোখে মায়ের একটি ভাঙাচোরা বিদ্ধস্ত মুখের ছবি ভাসে।

মান্টো তার বাবার মুখের দিকে তাকায়। বাবার মুখও ভাবলেসহীন, যেন কোন বিপর্যয়ের ছায়াটুকু নেই। যেন ঈশ্বরের মতো একটি পবিত্র একটি সৌম্য সৌন্দর্য বাবা।

মায়ের কথিত অপরাধের বিষয়ে বাবার ইচ্ছাটুকু অনায়াসে বুঝে নেয় মান্টো। সমস্ত লোকেদের চোখে যা অপরাধ, সৌভাগ্যবান মান্টোর বাবার চোখে মা তা নন।

বাবার চোখে মা সেচ্ছায় তার ভাগ্যকে মেনে নেয়া একজন বঞ্চিত মহিওসী, যে তার শারীরবৃত্তীয় ইচ্ছা এবং অভাব কখনোই পুরোন করতে সচেষ্ট ছিলেন না এবং এক দিনের জন্য কোন এক পুরুষের কাছে সমর্পিত হওয়া ছিল তার জন্য অতি স্বাভাবিক।

মান্টোর চোখে একটি খুশীর ঝলক ঢেউয়ের মতো খেলে যায়। মান্টো সাহস পায় বড় হবার এবং কথিত সমস্ত সাধরণ মানুষকে ছাড়িয়ে যাওয়ার।

"মান্টোর বাবা ছিল সময়ের সবচেয়ে সুন্দর বাবা"।

বাবার প্রতি মান্টোর সমস্ত শ্রদ্ধা বিগলিত হয়ে ঝরে পড়তে থাকে এবং বাবাকে মনে হয় সমস্ত সাধারণকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক পাহাড় মানুষ।

শান্ত সকালের মতো মান্টোর ভেতরের সামান্যতম জটিলতাটুকুও দূর হয়ে যায়।

গত এক বছর যাবৎ মান্টোদের বাসায় যে লোকটি সবচেয়ে বেশি আসতো সে তার মায়ের স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান। যেদিনই মা পেনশনের টাকা তুলে নিয়ে আসেন সেদিনই সেই বানরমুখো লোকটি আসতো। মান্টো বুঝতে পারেনা। সে ভাবে, হয়ত মা ধারের টাকা নিয়মিত শোধ করে যাচ্ছেন।

তারপর যেদিন লোকটির সাথে মায়ের ঝগড়া হলো তার পরদিনই মামা এলেন মাকে খুন করতে। মান্টো কিছুই বুঝতে পারলো না। সে যথারীতি কলেজে গেলো এবং তার সব বন্ধুদের চাহনিতে অন্য রকম কিছু একটা দেখতে পেলো।

তারপর তাকে নিয়ে কেউ কেউ ঠাট্টা করলো, কেউ কেউ সমব্যথী হলো মান্টোর এমন মা এবং তার দুর্ভাগ্যের জন্য। কিছু শিক্ষক ভেতরগত কৌতুক নিয়ে তাকে শান্তনা দেবার চেষ্টা করলো। মান্টো ছিল বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত।

চারেপাশের ফিসফিসানির মধ্যে একটু একটু জোড়াতালি হয়ে ঠিক মান্টোর কান পর্যন্ত চলে এসেছিল একটি ঘটনা।

মান্টো যখন ঘটোনাটি সমস্ত চেতনা দিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে, তখন তার চোখে ভেসে উঠলো গত এক বছর ধরে মায়ের পেনশনের সমস্ত টাকার কথা। মায়ের সংসার চালানোর দুরবস্থার কথা, বাবার চিকিৎসা এবং তার পড়ার খরচ দিতে গিয়ে একজন মহিলার প্রতিদিনকার ভেঙেচুড়ে যাওয়া চেহারাটির কথা!

মান্টোর কোন রাগ হলোনা। বরং গভীর রাত পর্যন্ত পড়ার সময় অক্লেশে টেবিলের পাশে বসে থাকা মায়ের সেই দুঃখী মুখটি বারবার ভেসে উঠতে লাগলো।

মান্টো পরদিন সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছবিগুলোও পেলো। আলাদীনের চেরাগের মতো হুট করে পেলোনা, তার বন্ধুরা পরিকল্পিতভাবেই তার মোবাইলফোনে ছবিগুলো ট্রান্সফার করে দিয়েছিল।

মান্টো সেদিন বাড়ি চলে এলো। বরাবরের মতোই তার কোন ভাবলেস নেই। সে অখুশীও নয় খুশীও নয়।

তারপর থেকে মায়ের সেই ছবিগুলো বহুবার সে দেখেছে। ছবিগুলো ঠিক যেন মায়ের বিদ্ধস্ত মুখের মতোই ভাঙাচোরা। প্রতিটি ছবি যেন তার মায়ের এক একটি কুকড়ে যাওয়া মুহূর্ত।

প্রতিদিন স্নেহময়ী ক্লান্ত মায়ের প্রতি জেগে ওঠা শ্রদ্ধার মতোই মায়ের যৌনাঙ্গের ছবিগুলোর প্রতিও শ্রদ্ধায় মান্টোর মাথা বো-ডাউন হয়ে আসতে থাকে।

গল্পের শুরুতে বলেছিলাম, "মান্টো ছিল সময়ের সবচেয়ে সুন্দর সন্তান", মায়ের সমস্ত কিছুই যার কাছে ছিল শ্রদ্ধার।

[৩]

মান্টো তার বাবাকে ছবিগুলো দেখালো। বাবার ভেতরে প্রথমেই একটা ধাক্কা অনুভব করল মান্টো, তারপর শান্ত স্থিরতা। মান্টোর মনে হলো বাবার ভেতরে যেন বহুকালের যে একটা অতৃপ্তি ছিল সেটি আর নেই। বাবা যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মনের মধ্যে একটি স্থির চিত্র গুছিয়ে নিয়েছেন। বাবা কি আত্মহন্তারক হতে চান, অথবা অন্য কোন কিছু?

মান্টো এই মুহূর্তে বাবাকে ঠিক বুঝতে পারেনা। সে বাবাকে পড়তে চেষ্টা করে এবং সে বাবার কাছে একটি ছবি দেখিয়ে বলে, "এই হলো আমার মানব জনমের সবচেয়ে প্রিয় পথ, সবচেয়ে পবিত্র পথ। এই হলো মায়ের বুক, আমার কাছে যা বেহেস্তের তলদেশে বয়ে যাওয়া মধু অথবা দুধের নহরের চেয়েও পবিত্র। আমি আমার পৃথিবীতে আসার পবিত্র পথকে শ্রদ্ধা করি"। মান্টোর সেইসব সন্তানদের কথা মনে পড়ে যারা তার বন্ধু হয়েছিল। অথচ ওদের এবং ওদের মায়েদের জন্য তার করুণা হয়।

মান্টোর বাবা স্নেহে সন্তানের চুল নেড়ে দেন। তারপর মাকে ডাকেন বাবা। মান্টো চলে যায় তার লাইব্রেরি ঘরে। বাবা এবং মা ততক্ষণে হয়ত অন্য কোন পরিকল্পনা করেন।

মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে যাওয়া মায়ের ছবিগুলো নিয়ে মানুষ কানাঘুষা করে। মান্টোর দিকে তাকায়। মান্টো কিছুই বলে না। মান্টো ভেবে পায়না মানুষের ভুলশুদ্ধ। সে ভাবে, মানুষেরা কত সাধারণ, কত অসহায়!

পরদিন আবার মামা আসেন। তিনি মাকে খুন করতে চান। তার হাতে থাকে একটি রুপালী ছুরি। রুপালী ছুরিতে রোদ পড়ে। মান্টো কিছুক্ষণের জন্য ভয় পায় এবং মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। অকথ্য গালিগালাজে মান্টোর কান বন্ধ হয়ে আসে। মামা মায়ের চুল ধরেন এবং মাটিতে ফেলে দেন। মামা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন এবং তারপর ছুটে চলে যান। মান্টো মাকে মাটি থেকে তুলে দেয় এবং লাইব্রেরী ঘরে চলে যায়।

অসংখ্য মানুষ যখন মামাকে অপমান আর টিটকারি করে মামার মাথায় তখন খুন চাপে। মামা প্রায়ই ছুরি নিয়ে দৌড়ে আসতে থাকেন এবং আবার ফিরে যান। মামাকে মান্টোর কাছে মনে হয় মায়ের চেয়েও বেশি অসহায় কেউ।

পরদিন আসে গ্রামের মুসুল্লিদল এবং তারা ঘটনাটিকে ব্যবচ্ছেদ করতে থাকে। কেউ কেউ মুচকি মুচকি হাসে। কেউ কেউ অযথা তরপাতরপি করে। মান্টো উঠোনে এসে দাঁড়ায়, ওদের কথা শোনে। ওদের মুখভঙ্গি এবং কথাগুলো মান্টোর কাছে ভয়ানক অসভ্যতার মতো মনে হয়।

তারপর ওরা একটি শব্দ উচ্চারণ করে। ওদের বিধানে ওটাই ছিল সবচেয়ে যোগ্য শব্দ। মান্টো শব্দটি প্রথম শোনে। ওরা নিয়ম বিধান আরও কী কী নিয়ে যেন আলোচনা করে। মান্টো বোঝেনা।

মান্টোর কলেজ থেকে এরপর আসেন তার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক। তিনি কিছুক্ষণ মুসুল্লিদের সাথে আলাপ করেন এবং বলেন, ওনারা স্কুল কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছেন কিনা। ওনারা বলেছেন তিনি একজন সম্মানী মানুষ এবং ওনারা যান নি।

মান্টোর প্রিয় শিক্ষক চুপ করে থাকেন। তারপর আসে বৃষ্টি। ঝুৃ্ম বৃষ্টিতে ভিজে যায় উঠোনবাড়ি, গাছ এবং ঘরের সব চাল বেয়ে পড়ে মিষ্টি জল। মান্টো ঘরে আসে। মায়ের দুঃখী মুখের দিকে চেয়ে একই সাথে অনেগুলো গল্প পড়তে থাকে সে। মায়ের মুখমণ্ডল যেন কখনও কখনও এক একটি কালজয়ী গল্প হয়ে ওঠে মান্টোর কাছে।

[৪]

মান্টো এখন আর ঘর থেকে বের হয়না। ঘর থেকে বের হলে প্রায় সব মানুষ'ই ওর দিকে নিরীক্ষক দৃষ্টিতে তাকায়। হাসে। আপাদমস্তক খেয়াল করে। কেউ কেউ গালি দেয়। কেউ কেউ বলে, "তোর মাকে এক রাত এক দিন আমার কাছে থাকতে পাঠাস"।

মান্টো নির্লিপ্ত থাকে। ওদের দীনতা মান্টোকে মনে করিয়ে দেয় একটি ডেভেলপিং সাবকন্টিনেন্ট এর নিকট ভবিষ্যতের কথা এবং জনগনের জননী ও কন্যাদের দুর্ভাগ্য।

খুব নিকট ভবিষ্যতের প্রজন্মগুলো নারীকে মাংসের বাইরে চিন্তা করতে পারে না। প্রজন্মান্তরে হয়তবা আছে সুসংবাদ ও সুসংহতি।

মান্টো এখন নারী এবং পুরুষ বিষয়গুলোর জটিলতা বুঝতে শিখেছে।

এখন সে ভাবতে পারে শরীর ও সততার চিত্রগুলো। এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সহজ পদ্ধতিগুলো। গত গল্পে একজন স্বশিক্ষিত সংশয়বাদী যা বলতে চেয়েছিলেন এবং বারবার তাকে থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। মান্টো সেই স্বশিক্ষিত সংশয়বাদীকেও চিনতো এবং মান্টোর চিন্তাজগত এখন অনেক বিস্তৃত।

মান্টো ওদের কথা ভাবে। ভাবতে থাকে কতকাল লাগবে চলমান পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নয়নকাল আসতে। মান্টোর ভেতরে অসংখ প্রশ্নের উদয় হতে থাকে। উন্নয়নশীলতা আসলে কী। কীসের উন্নয়ন একটি পৃথিবীর জন্য প্রকৃত প্রয়োজন।

পুজিবাদী সংস্কৃতি কি মান্টো এবং তার বন্ধু এবং নারীদের মুক্তি দিতে পারে? অথবা লেনিনবাদ বা তার অন্য কোন উকুইভ্যালেন্ট? মান্টো আকাশ পাতাল ভাবে। মান্টোর চোখে তার বন্ধু এবং কয়েক শিক্ষকের লোভাতুর চোখ ভেসে ওঠে। তার চোখে ভাসে অসহায় মায়ের পবিত্রতম এবং অসহায় যননাঙ্গের ছবিগুলো। "শ্রদ্ধা"।

তারপর চলতে থাকে আরও কয়েকটি অসভ্য দিন। নির্মম ও লোভাতুর কয়েকটি মানুষের চোখ নিয়মিত চোখের সামনে আনাগোনা করে। বর্ষার সময়টা সংখ্যাহীন এবং অসংযত দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে যেতে থাকে।

ধীরে ধীরে মায়ের ভেতর এক ভয়ানক বিষণ্ন নিরবতা বাসা বাঁধতে শুরু করে। অথচ মা নিজেই মান্টোকে বলতেন, "হেরে যাওয়া মানেই অন্যদের জিত"। মান্টো যেন মায়ের কথাগুলো এবং মাকে মেলাতে পারেনা। তার ভেতরে নিরব অস্থিরতা খেলা করে।

কিছুদিন পরই মান্টোর সেই প্রিয় স্যারের একটি চিঠি আসে। চিঠিটি খুব বড় নয়। অল্প কিছু শব্দ এবং কয়েকটি পঙক্তিতে গাঁথা। মান্টো চিঠিটি পড়ে। মান্টোর অসাধারণ ভালোলাগে সেদিন।

মান্টো তার প্রিয় শিক্ষকের কাছে ছুটে যায়। মান্টো তাকে বলে, যেন গ্রামের নবান্নে চিঠিটি পড়ে শোনানো হয়।

স্যার ঠিক তা'ই করতে চেয়েছিলেন। একই কাজ। তিনি চেয়েছিলেন কিছু কথা মানুষকে বলতে, যেগুলো মানুষের জানা দরকার ছিল।

স্যার ছিলেন এক স্থির চরিত্রের সত্যনিষ্ঠ দার্শনিকের মতো। স্যার ছিলেন ছেলেগুলোর বাবার মতো অথবা তাদের চেয়েও ধৈর্যশীল। তিনি ছিলেন শান্ত সুহৃদসম্মিত এবং শক্তিমান ব্যক্তিত্বের এক শ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন চিন্তার মুক্তিকামনায় প্রবল বিশ্বাসী। তিনি ছিলেন স্বকীয়। নিজেকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য তিনি নিজেই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য।

অথচ তার চারপাশে ছিল অজস্র কুক্ষিগত চিন্তক ও নরকাবাসীরা। যারা কোনদিন বের হতে পারেনি প্রাচীনতম পরিকল্পনা থেকে। যারা নারী এবং বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু সম্পর্কে প্রাগৈতিহাসিক ধারণাগুলো চেপে ধরে থাকতে ভালোবাসতো। যারা নিজের মা এবং জন্মমূল ভালোবাসতে পারেনা কোনদিন।

তারা বিদেহী আত্মাদের মতো ভীর করতো এবং চিৎকার করে সময়গুলো পাড় করে দিতো।

প্রিয় স্যার মান্টোকে শান্তনা দিতে চান'নি। কিন্তু মান্টোর নিজেকে মনে হয়েছিল ভীষণ শান্ত, সমৃদ্ধ। মান্টো নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছিল।

[৫]

তারপর একদিন নবান্ন আসে এবং গ্রামের সমস্ত মানুষ দহলিজে জড়ো হয়। মান্টোর প্রিয় স্যার সকলের সামনে একটি উঁচু টিলাবৎ খড়ের গাদায় উপবিষ্ট হন এবং তার পকেট থেকে একটি চিঠি বের করেন। তিনি ধীরে ধীরে চিঠিটির ভাজ খুললেন, যেমন প্রেমিকেরা ভাজ খোলে শাড়ি ও শরীরের। এটি খুব যত্ন সহকারে খোলা হয়েছিল।

তিনি মাত্র কয়েকটি লাইন পড়লেন। লাইনগুলো মান্টো দ্বিতীয়বার শুনলো। তার মনে হচ্ছিল চিঠিটি যেন এক অমরাবতী গল্পের মতো। সমস্ত মানুষ নীরব হয়ে কী যেন ভাবতে লাগলো। তাদের মুখ থেকে আর কোন কথা বের হলো না। তারা বাকরুদ্ধ হয়ে মাটিতে বসে পরেছিল। আসলে তারা প্রথমবারের মতো এমন সব কথা শুনেছিল যা তারা আর কোনদিন শোনেনি।

মান্টো ফিরে এলো। মায়ের হাতে চিঠিটি দিলো এবং মাকে স্যারের চিঠিটি পড়ার ধরণ ও জনতার ভঙ্গিগুলো একে একে বললো।

ছোট চিঠিটিতে লেখা ছিল, "আমাদের নৈতিকতা এবং ধর্মের বাইরেও এমন কিছু সত্য থাকে যা আমরা সকলেই আমাদের ভেতরে লালন করি। আমরা তা ধারণ করি অথচ স্বীকার করিনা। আমরা জিনগতভাবে প্রত্যেকেই মিথ্যুক। 'এক দিনের জন্য হলেও সত্য স্বীকার করুন এবং ভাবুন'।"

সবাই নির্বাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো।

প্রিয় স্যার বললেন, "আমরা নারীর অব্যক্ত বাসনাগুলোকে কোনদিনই ভাবিনি। আমরা একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক চাহিদাকে নিয়ে হাস্যরস করি। অথচ নিজেদের ক্ষেত্রে তা সহসায় পুরণ করার ফন্দিতে আমরা সব সময়'ই প্রথম স্থান অধিকার করেছি।

যে নারী চিরকাল যৌবন বেঁধে রাখে আমরা তাকে জনতার সামনে বাহবা দেই অথচ সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করে তার শ্লীলতা হানির জন্য প্রতিনিয়ত নানান কৌশল রপ্ত করতে থাকি। একজন নারীর শরীরবৃত্তীয় স্বাধীনতাকে আমরা স্বীকার করতে অপারগ। কারণ আমরা জিনগতভাবে অটোক্রেট'ও।

মনে হচ্ছিল জনতা ধৈর্যহারা হয়ে যাবে। অথচ তাদের মধ্যে গুটিকয়েক প্রবীণ ও জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন, যারা ধমক দিলেন এবং বললেন, আপনারা চুপ করুন এবং কথাগুলো শুনুন।

কিছুক্ষণ থেমে গিয়ে স্যার আবার বললেন, "প্রতিজন পুরুষের মতো প্রতিজন নারীকেও ঈশ্বর শরীর ও কামনা দিয়েছেন। এটি বায়ুবীয় নয়, এটি মৃত্যুর মত ধ্রুব এবং সুন্দর ও সুখের। আমরা যদি তাকে সত্য মানি! অথচ আমরা বৈষম্যের ক্ষেত্রে অটল।

আমরা একজন পুরুষের অন্যায়কে নারীর উপরে চাপিয়ে দিই এবং বিকৃত আনন্দ আত্মহারা হই। অথচ আমরা জানিনা, আমাদের জানার বাইরেও আছে অসংখ্য সুমহান সত্য"।

স্যার বললেন, "নারীদের যৌন স্বাধীনতা মূল্যায়িত হোক, পুরুষের বিকৃত সুখ ও প্রভুত্ব লোপ হোক"।

স্যার নিচে নেমে এলেন এবং জনতার সাথে মিশে গেলেন।

কারো মুখে'ই কোন কথা নেই। সামান্য সময়ের জন্য সকলেই নিবিষ্ট কবি অথবা দার্শনিক। অথচ কে কতটুকু কী বুঝেছে কিছুই বলা গেল না। তবে সকলের মুখে যেন একটি পরিবর্তিত মুখোশ।

মান্টো ফিরে এসেছিল।

মান্টো এসেছিল তার লাইব্রেরী ঘরে। মূলত বইয়ে ঠাসা লাইব্রেরীটি ছিল তার একমাত্র শোবার ঘর'ও। সেদিন মান্টো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। সে স্বপ্ন দেখে অসংখ্য মানুষ সত্যকে ঘিরে গল্পে মশগুল।

মান্টোর মস্তক তার মায়ের যৌননাঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে। কারণ এটি কেবল সংগমদ্বার নয়, এটি পৃথিবীর একটি অনন্য সৃষ্টিদ্বার। এটি পৃথিবীর প্রাণ ও পূর্ণতার দ্বার, যার ভোতর দিয়ে মান্টো এসেছিল।

মান্টো তারপর একটি ছবি আঁকে। পিকাশোর 'ইরোটিক সেন্স অব ফিগার' বা 'নিউড ইন্টু দ্য ফরেস্ট' বা 'আলজিয়ার্স এর নারী'র মতো নয়, অথচ দেখতে ঠিক ওসব আবেদনময় ছবির মতোই। কারণ নারীর যোনিপথের এই ছবির মধ্যে যৌনতা নেই, আছে প্রাণের আবির্ভাব। যারা জ্ঞানী তারা সহসায় বুঝতে পারে।

মূলত এটি একটি জন্ম বৃত্তান্তের ছবি। মান্টো ছবিটি আঁকার সময় নিজেরই জন্মের কথা কল্পনা করতো। কল্পনা করতে থাকতো একটি সামান্য পথ ও তার আকৃতির কথা এবং মায়ের মৃত্যুর শতভাগ সম্ভাবনার কথা! সে কেঁপে উঠতো! মান্টো ছিল সময়ের সবচেয়ে সুন্দর সন্তান, আগেও বলেছিলাম।

মান্টোর চিত্রকর্মটি সকলের কাছে তৎক্ষণাৎ বোধগম্য না হলেও প্রিয় স্যার বুঝতে পেরেছিলেন। ওটি ছিল অনন্য। অথচ ঠিক মায়ের যৌনাঙ্গের ছবিগুলোর মতোই চিত্রটি প্রায় সকলের কাছেই ছিল লোভনীয়।

অথচ মাত্র একশ বছর পর অসংখ্য মানুষের কাছে প্রাণের আবির্ভাব নামের এই ছবিটি হয়ে উঠবে সবচেয়ে নন্দিত চিত্রকর্ম। যে ছবির পাশে থাকবে একটি চিঠি এবং একজন নারীর যৌন স্বাধীনতার ভাস্কর্য।

শেষ...

Tuesday, August 4, 2020

 এক বিএসএফের গুলিতে দুই বিএসএফ নিহত


Image may contain: one or more people, grass, outdoor and nature

এক বিএসএফের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে ব্যাটেলিয়নের অপর ২ সেনার। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের ভাতুন গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৩টা নাগাদ ঘটনাটি ঘটে।

ভাতুন গ্রাম পঞ্চায়েতের বিএসএফ এর ১৪৬ নম্বর ব্যাটালিয়নের মালদাখণ্ড সীমান্ত চৌকিতে এ দিন গুলির শব্দে গোটা ক্যাম্প কেঁপে ওঠে। অভিযুক্ত জওয়ান উত্তম সূত্রধর গুলি চালান তারই দুই সহকর্মীকে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বিএসএফ ইন্সপেক্টর মহিন্দর সিং ভাট্টি ও কনস্টেবল অনুজ কুমারের।

অল্প সময়ের মধ্যে নিজেই সীমান্ত চৌকির কমান্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ এর মালদাখণ্ড সীমান্ত চৌকিতে।

গুলিবিদ্ধ মৃত বিএসএফ ইন্সপেক্টর মহিন্দর সিং ভাট্টি ও কনস্টেবল অনুজ কুমারের মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রায়গঞ্জ থানার পুলিশের হাতে তুলে দেয় বিএসএফ। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে রায়গঞ্জ থানার পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রায়গঞ্জ থানার ভাতুন গ্রামপঞ্চায়েতের ভারত- বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার মালদাখন্ড সীমান্ত চৌকির বর্ডার রোডে চৌকির কাজে যুক্ত ছিলেন বিএসএফ এর ইন্সপেক্টর মহিন্দর সিং ভাট্টি, কনস্টেবল অনুজ কুমার এবং বিএসএফ জওয়ান উত্তম সূত্রধর। সোমবার রাতে তাঁরা সীমান্ত প্রহরায় দায়িত্বে ছিলেন। মঙ্গলবার ভোররাতে সাড়ে তিনটে নাগাদ আচমকাই বিএসএফ জওয়ান উত্তম সূত্রধর তার স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে অপর দুজনকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। সীমান্তেই ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় বিএসএফ ইন্সপেক্টর মহিন্দর সিং ভাট্টি ও কনস্টেবল অনুজ কুমারের। এরপর নিজেই মালদাখন্ড সীমান্ত চৌকির কমান্ডারের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন ঘাতক বিএসএফ জওয়ান উত্তম সূত্রধর।

এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে মালদাখন্ড সীমান্তচৌকি এলাকায়। ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসে রায়গঞ্জ থানার পুলিশ ও বিএসএফ এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযুক্ত বিএসএফ জওয়ান উত্তম সূত্রধরকে রায়গঞ্জ থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে বিএসএফ কর্তৃপক্ষ।

রায়গঞ্জ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার সুমিত কুমার জানিয়েছেন, রায়গঞ্জ থানার বিএসএফ এর ১৪৬ নম্বর ব্যাটালিয়নের মালদাখন্ড সীমান্ত চৌকির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ জওয়ানদের মৃতদেহ উদ্ধারে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছেছে। কেন জওয়ান গুলি করে তাদের হত্যা করল, তা জানতে পুলিশি তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রায়গঞ্জ হাসপাতাল মর্গে নিয়ে আসা হয়েছে।

সূত্র:হিন্দুস্থান টাইমস

Wednesday, February 26, 2020

বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বিএনপি-জামাত জড়িত !
যারা নিহত হয়েছেনঃ

খালেদা, নিজামী যখন জেএমবি ও জঙ্গিদের অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করেছিলেন এবং বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে মন্তব্য করেছিল। সে সময় শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কর্নেল গুলজার মুফতি হান্নান, বাংলা ভাই, শায়খ রহমান, আতাউর রহমান সানিসহ শীর্ষ জঙ্গি গ্রেফতার করে তাদের মুখে চপেটাঘাত করেছিল।
মেজর জেনারেল শাকিল, কর্নেল গুলজারসহ নিহতদের মধ্যে যারা ২০০৮ এ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে কর্নেল এলাহি, কর্নেল মোয়াজ্জেম,দেশের প্রথম প্যারা-কমান্ডো কর্নেল এমদাদ, কর্নেলইনসাত, কর্নেল লতিফুর রহমান, কর্নেল নকিবুর রহমান,কর্নেল ইমাম শাখাওয়াত, লে: কর্নেল রবি রহমান, কর্নেল এহসান, মেজর মাসুম, মেজর রফিক, মেজর খালিদ ও মেজর মাহবুব অন্যতম।
উল্লেখ্য এইচ এম এরশাদের ভাগ্নে ছাড়াও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন আইজিপি নুর মোহাম্মদের জামাতা ক্যাপ্টেন মাজহারুল হায়দার।
অভিযুক্তদের পক্ষে কেন বিএনপি জামাত আইনী লড়াই করেছে?
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের প্রেক্ষাপট বুঝতে অভিযুক্ত আসামীদের পক্ষে কারা আইনী লড়াই করেছে সেই আইনজীবীদের তালিকাটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ থেকে অনুধাবন করা যায় যে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের সকল সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল বিএনপি-জামাত।
কারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত?
• ডিএডি তৌহিদ, বিদ্রোহী সিপাহী মাঈন, সুবেদার মেজর গোফরান মল্লিক সহ যে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের প্রায় সকলে বিএনপি আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত।
• টাঙ্গাইল থেকে গ্রেফতার হওয়া ২২ জন বিডিআরসদস্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলার আসামী বিএনপির উপমন্ত্রী সালাম পিন্টুর সুপারিশে চাকরি পেয়েছিল।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের দু’দিন পর খালেদা জিয়া সম্মুখে আসেন। তিনি বলেন, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা ভুল ছিল।
এ বক্তব্যেই বোঝা যায় তিনি কি চেয়েছিলেন। বিএনপিপন্থী কয়েকটি মিডিয়া বা সাদেক খানরা বিডিআরের পক্ষে অবস্থান নিয়েও পরবর্তিতে মত পরিবর্তন করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী বল প্রয়োগ করা হলে প্রাণহানি ঘটতো অগণিত মানুষের। অন্যদিকে সিলেট, সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি এলাকায় বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। রংপুরে তিনজন সেনাকর্মকর্তাকে জিম্মি করা হয়েছিল।